উত্তরাধিকারসূত্রে মেধা বনাম পরিশ্রমের প্রতিযোগিতা
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া মেধা সব যুগেই মূল্যবান। স্বাভাবিক প্রতিভা, দ্রুত শেখার ক্ষমতা, বিশ্লেষণী দক্ষতা কিংবা স্মৃতিশক্তি—এসব একজন শিক্ষার্থীকে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থায় যখন মূল্যায়নের মান শিথিল হয়ে যায়, তখন শুধু জন্মগত মেধাই নয়—পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতিও নতুন করে প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এ প্লাস ও গোল্ডেন এ প্লাসের সংখ্যা এত দ্রুত বেড়েছিল যে, অনেকের মনে স্বাভাবিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল—ফলাফলের এই উল্লম্ফন কি শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতার সমানুপাতিক ছিল?
হাসিনা সরকারের সময় শিক্ষায় উচ্চ পাসের হার ও ভালো ফলকে অনেক ক্ষেত্রে সাফল্যের প্রধান সূচক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু ফল ভালো দেখানোর চাপ, পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা, গাইডনির্ভর প্রস্তুতি, মুখস্থনির্ভর উত্তর, দুর্বল মূল্যায়নব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ—সব মিলিয়ে শিক্ষার প্রকৃত মান নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
খাতা যত বেশি ভরা, নম্বরও যেন তত বেশি—এমন অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে শোনা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর বিশ্লেষণী ক্ষমতা, বিষয়ভিত্তিক বোঝাপড়া বা মৌলিক জ্ঞানের চেয়ে নির্দিষ্ট প্যারাগ্রাফ, রচনা ও সাজানো উত্তর মুখস্থ করাই পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার প্রধান কৌশল হয়ে উঠেছিল।
ফলাফল ছিল দৃশ্যমান—এ প্লাসের বন্যা, গোল্ডেন এ প্লাসের বিস্তার এবং শতভাগ পাসের সাফল্য। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই ফলাফল কি শিক্ষার প্রকৃত মানকে প্রকাশ করেছিল, নাকি পরীক্ষার ফলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি সাফল্যের পরিসংখ্যান ছিল?
আমার স্ত্রী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক—দুই পরীক্ষাতেই গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে। সে অত্যন্ত মেধাবী এবং পড়াশোনায় সমৃদ্ধ একজন শিক্ষার্থী। স্বাভাবিকভাবেই তার সেই অর্জন নিয়ে গর্ব করার যথেষ্ট কারণ আছে।
সম্প্রতি এ বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে তর্ক হয়েছে।
আমার বক্তব্য ছিল—কোনো পরীক্ষায় পাওয়া জিপিএকে শুধু একটি সংখ্যা হিসেবে দেখলে হবে না; দেখতে হবে সেই সময়ের প্রশ্নের মান, পাঠ্যক্রম, মূল্যায়নপদ্ধতি, পরীক্ষার পরিবেশ এবং নম্বর প্রদানের মানদণ্ডও।
এবারের এসএসসি ফল প্রকাশের সময় কয়েক দফা পরিবর্তিত হয়েছে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—ফল খারাপ হওয়ার কারণে ফল প্রকাশ পিছিয়েছে, এমন কোনো সরকারি তথ্য এখনো নেই। ২৮–৩০ শতাংশ পাসের যে আলোচনা চলছে, সেটিও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়। ফল প্রকাশের আগে এসব সংখ্যাকে সত্য হিসেবে প্রচার করা দায়িত্বশীল হবে না।
তবে যদি ভবিষ্যতে দেখা যায়, মূল্যায়ন কঠোর হয়েছে এবং পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে—তাহলে সেটিকে শুধু “ফল খারাপ” বলে ব্যাখ্যা করাও যথেষ্ট হবে না। তখন প্রশ্ন উঠবে, আগের বছরগুলোর উচ্চ পাসের হার কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও দক্ষতার প্রতিফলন ছিল, নাকি মূল্যায়নব্যবস্থার উদারতার ফল ছিল?
আমার স্ত্রীর আপত্তিটাও যুক্তিসঙ্গত।
কারণ সে যে সময়ে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে, সেই ফল তার ব্যক্তিগত পরিশ্রম, মেধা এবং অর্জনের অংশ। পরবর্তী সময়ে মূল্যায়নপদ্ধতি কঠোর হয়েছে বলে অতীতের সব ভালো ফলকে এক কথায় অবমূল্যায়ন করা অন্যায়।
কিন্তু আমার প্রশ্নটিও থেকে যায়—
একটি প্রজন্মে যে নম্বর এ প্লাস পাওয়ার জন্য প্রয়োজন হতো, অন্য প্রজন্মে যদি একই নম্বর শুধু পাসের সীমার কাছাকাছি হয়ে যায়, তাহলে দুই প্রজন্মের ফলাফলকে কি একই মানদণ্ডে বিচার করা সম্ভব?
সম্ভবত উত্তর হলো—না।
একটি জিপিএ কখনো একা কোনো শিক্ষার্থীর সম্পূর্ণ মেধার পরিচয় নয়। পরীক্ষার মান, প্রশ্নের গভীরতা, মূল্যায়নের কঠোরতা এবং শিক্ষার পরিবেশ—সবকিছু মিলিয়েই একটি ফলাফলের প্রকৃত অর্থ তৈরি হয়।
তাই কারও গোল্ডেন এ প্লাসকে ছোট করা যেমন ভুল, তেমনি বিপুল সংখ্যক এ প্লাস দেখেই শিক্ষাব্যবস্থাকে সফল ঘোষণা করাও ভুল।
শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বেশি পাস নয়; প্রকৃত জ্ঞান, যুক্তিবোধ, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সৃজনশীলতা এবং বাস্তব জীবনে সেই জ্ঞানের প্রয়োগ।
কারণ সার্টিফিকেটে লেখা জিপিএ একজন শিক্ষার্থীর ফলাফল জানায়—কিন্তু তার প্রকৃত মেধা, জ্ঞান ও সক্ষমতার সম্পূর্ণ পরিচয় দেয় না।
টিটপ হালদার
কবি ও সংগঠক
