সাহিত্য

উচ্ছেদ নয়, পুনর্বাসন চাই: জীবিকার অধিকার ও মানবিক উন্নয়নের প্রশ্ন

একটি ছোট দোকান শুধু ব্যবসার জায়গা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের শ্রম, আত্মসম্মান, পরিবার ও ভবিষ্যৎ।
একটি দোকান উচ্ছেদ করা হয়তো প্রশাসনিকভাবে সহজ। কিন্তু সেই দোকানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু বছরের পরিশ্রম, তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্ন এবং একটি পরিবারের জীবিকার নিশ্চয়তা কি এত সহজে সরিয়ে দেওয়া যায়?
রমনা কালীমন্দির এলাকার এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জীবনের গল্প আজ সেই প্রশ্নই সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রায় বারো বছর আগে, যখন রমনা কালীমন্দিরে সবে হরিচাঁদ ঠাকুরের বিগ্রহ স্থাপন করা হয়, তারও আগে জীবিকার সন্ধানে গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। শুরুটা ছিল অত্যন্ত সামান্য। মোমবাতি, ধূপকাঠি ও লাল সুতো বিক্রি করেই চলত জীবিকা। অল্প পুঁজি, কঠোর পরিশ্রম এবং দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে একটি ছোট দোকান।
সেই দোকান কোনো বিলাসিতা ছিল না। সেটিই ছিল তাঁর জীবনের প্রধান অবলম্বন।
বছরের পর বছর মন্দিরে আগত ভক্ত ও দর্শনার্থীদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রি করে তিনি নিজের জীবন ও পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করেছেন। ছোট্ট এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তাঁর শ্রম, আত্মসম্মান এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
আজ তিনি উচ্ছেদের মুখে।
এখানে প্রশ্ন শুধু একটি দোকান সরিয়ে দেওয়া বা একটি স্থাপনা উচ্ছেদের নয়। প্রশ্ন হলো—যে মানুষ বছরের পর বছর একটি নির্দিষ্ট স্থানে ব্যবসা করে জীবিকা গড়ে তুলেছেন, তাঁর জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা করা হয়েছে কি?
যদি নগর-পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, নিরাপত্তা, সৌন্দর্যবর্ধন, মন্দিরের শৃঙ্খলা কিংবা অন্য কোনো জনস্বার্থে উচ্ছেদ প্রয়োজন হয়, তাহলে সেই প্রয়োজন নিয়ে আলোচনা হতে পারে। জনস্বার্থে পরিকল্পিত উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু উন্নয়নের নামে প্রান্তিক মানুষের জীবিকার পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া কোনো মানবিক সমাধান হতে পারে না।
উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
বিকল্প দোকান, নির্ধারিত ব্যবসার স্থান অথবা পুনর্বাসনের একটি বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ করা হলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সামনে অনিশ্চয়তার একটি কঠিন বাস্তবতা তৈরি হয়। একটি দোকান হারানো মানে শুধু আয় বন্ধ হওয়া নয়; এর অর্থ হতে পারে পরিবারের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়া।
উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের জীবনকে আরও নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ করে। শুধু স্থাপনা সরিয়ে ফেলা উন্নয়ন নয়; ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও উন্নয়নের অংশ।
আমরা পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিত নগরব্যবস্থা চাই। মন্দিরের পরিবেশ সুশৃঙ্খল থাকুক, জনসাধারণের চলাচল নিরাপদ হোক—এটিও জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে সেখানে দীর্ঘদিন ধরে জীবিকা নির্বাহ করা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অধিকার ও বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
যদি দোকান সরাতেই হয়, তবে বিকল্প জায়গা দেওয়া হোক।
যদি উচ্ছেদ করতেই হয়, তবে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।
যদি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তবে মানুষের জীবিকা ধ্বংস না করে পরিকল্পিত ও মানবিক সমাধান খোঁজা হোক।
কারণ একটি ছোট দোকান কারও কাছে সামান্য স্থাপনা হতে পারে; কিন্তু একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছে সেটিই তাঁর জীবন, তাঁর আত্মসম্মান এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ।
তাই দাবি একটাই—
উচ্ছেদ নয়, পুনর্বাসন চাই।
উন্নয়ন চাই, কিন্তু জীবিকা ধ্বংস করে নয়।
মানবিক ও ন্যায়সংগত সমাধান চাই।

— টিটপ হালদার (কবি ও সংগঠক)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *