তসলিমা নাসরিনের প্রত্যাবর্তন: দীর্ঘ সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ
তসলিমা নাসরিনের প্রত্যাবর্তন: দীর্ঘ সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, লেখকের স্বাধীনতা ও ঘরে ফেরার অধিকারের বিজয়
দীর্ঘ উনিশ বছর পর আবার বাংলার মাটিতে পা রাখলেন হাতেখড়ি–র লেখক তসলিমা নাসরিন। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন শুধু একজন লেখকের কোনো শহরে ফিরে আসা নয়; এটি দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, লেখকের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার এবং ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী বিজয়।
প্রয়াত বাবাই প্রথম আমাকে তসলিমা নাসরিনের লেখার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। ঢাকা থাকাকালে বাবা নিয়মিত পত্রিকা পড়তেন। ছোটোবেলায় আমাদের বাসায় প্রতিদিন কাগজ আংকেল দৈনিক জনকণ্ঠ পৌঁছে দিতেন। বাবা মূলত দুজন লেখকের কলাম পড়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন—একজন আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, অন্যজন তসলিমা নাসরিন। সেখান থেকেই তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে আমার কৌতূহল, পাঠ ও ভাবনার শুরু।
পরবর্তী সময়ে সমকাল, সর্বশেষ বাংলাদেশ প্রতিদিন—বিভিন্ন পত্রিকায় বুধবারের কলামের মাধ্যমে তিনি নিয়মিত পাঠকের কাছে উপস্থিত থেকেছেন। আমাদের ঘরেও দীর্ঘদিন নিয়মিত খবরের কাগজ আসত। ফলে তাঁকে নিয়ে আমার পাঠ, চিন্তা ও সাংস্কৃতিক চর্চা আজকের নয়; এর শিকড় বহু পুরোনো।
ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক পরিবেশের দীর্ঘ সময়ে তসলিমা নাসরিনকে ঘিরে বেশ কিছু সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাক্ষী ও অংশীদার হওয়ার সুযোগ হয়েছে। কাজটি সহজ ছিল না। এটি ছিল একজন লেখকের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই, তাঁর নিজের ভূখণ্ডে ফিরে আসার দাবি এবং দীর্ঘ এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের অংশ।
স্লোভাকিয়াপ্রবাসী বন্ধু ইতুলার বিশেষ সহযোগিতা এবং তসলিমাপক্ষের ব্যাপক অংশগ্রহণে প্রতিবছর উদযাপিত হতো এই লেখকের জন্মদিন। গান, কবিতা, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে তাঁকে স্মরণ করা হতো। প্রতিটি আয়োজন থেকে উচ্চারিত হতো একটি প্রধান দাবি—
তসলিমা নাসরিনের ঘরে ফেরা চাই।
২০১৬ থেকে ২০২৪—এই দীর্ঘ সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও প্রতিরোধের নানা পর্যায়ে আমি উপস্থিত ছিলাম। আজ পশ্চিমবঙ্গে তসলিমা নাসরিনের প্রত্যাবর্তন দেখে তাই ব্যক্তিগতভাবেও আনন্দ অনুভব করছি। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশে তসলিমাপক্ষের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক কাজ, পাঠচর্চা, প্রতিবাদ ও জনমত গঠনের প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ বিফলে যায়নি।
তসলিমা নাসরিনের ঘরে ফেরার দাবি আজকের নয়। বহু বছর আগে এই দাবি উচ্চারিত হয়েছিল ঢাকা থেকেই। আজকের সাফল্যের মালা যাঁরা গলায় তুলছেন, তাঁদের অনুভব করা প্রয়োজন—সেই মালার প্রতিটি ফুলের চাষ শুরু হয়েছিল বাংলাদেশে; দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, লেখক-শিল্পীদের উদ্যোগ এবং মুক্তচিন্তার মানুষের ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।
উনিশ বছরের নির্বাসন: প্রশ্ন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির কাছেও
পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘদিন ধরে বাঙালি সংস্কৃতি, সাহিত্য, উদারতা ও অসাম্প্রদায়িকতার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। অথচ সেই পশ্চিমবঙ্গেই তসলিমা নাসরিন প্রায় উনিশ বছর কার্যত প্রবেশ করতে পারেননি। প্রশ্ন হলো—কেন?
পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে ভোটের সমীকরণকে সামনে রেখে এই জনসংখ্যাকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছে। তসলিমা নাসরিনকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় সংগঠন ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর তীব্র প্রতিবাদ, বিক্ষোভ এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে সরিয়ে দেয়।
পরবর্তী সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারও তাঁকে কলকাতায় স্থায়ীভাবে ফিরে আসার সুযোগ দেয়নি। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়—একজন লেখকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে তাঁকে দীর্ঘদিন দূরে রাখা কি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ভূমিকা হতে পারে?
তসলিমা নাসরিন শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, ভারতের অন্য স্থানেও নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়েছেন। হায়দরাবাদে তাঁর একটি বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটেছিল। একজন লেখকের বক্তব্য বা লেখার সঙ্গে দ্বিমত থাকা স্বাভাবিক; কিন্তু মতের জবাব সহিংসতা, হামলা বা নির্বাসনের মাধ্যমে দেওয়া কখনোই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিচয় হতে পারে না।
যাঁরা নিজেদের নিপীড়িত, বঞ্চিত বা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরেন, তাঁদের কাছ থেকেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি একই রকম দায়বদ্ধতা প্রত্যাশিত। নিপীড়নের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা কাউকে অন্যের মতপ্রকাশের অধিকার দমনের নৈতিক অনুমতি দেয় না।
ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্ন ও রাজনৈতিক দ্বিচারিতা
ভারতের রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বহু রাজনৈতিক দল নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ ও উদার শক্তি হিসেবে পরিচয় দিলেও বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় রক্ষণশীলতার চাপে তাদের অবস্থান বদলাতে দেখা গেছে।
শাহ বানো মামলায় ভারতের সর্বোচ্চ আদালত মুসলিম নারীর ভরণপোষণের অধিকারের পক্ষে যে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিল, পরবর্তী সময়ে রাজীব গান্ধী সরকারের নতুন আইনের মাধ্যমে সেই রায়ের প্রভাব সীমিত করা হয়। সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আজও রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক রয়েছে। প্রশ্ন হলো—নারীর অধিকার ও নাগরিক সমতার প্রশ্নে রাজনৈতিক সুবিধাবাদকে কি ধর্মনিরপেক্ষতা বলা যায়?
একইভাবে, তসলিমা নাসরিনের ক্ষেত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরে যে আপস ও নীরবতা দেখা গেছে, তারও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন। ধর্মনিরপেক্ষতা যদি সত্যিই রাষ্ট্রের নীতি হয়, তবে কোনো লেখককে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক চাপের কারণে নির্বাসিত থাকতে হবে কেন?
তসলিমা নাসরিনের পশ্চিমবঙ্গে আগমন তাই নিঃসন্দেহে লেখকের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের একটি ইতিবাচক ঘটনা। এই প্রত্যাবর্তনের পেছনে যাঁরা ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, সেই ভূমিকার স্বীকৃতি প্রাপ্য। একই সঙ্গে বামফ্রন্ট ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের কাছেও প্রশ্ন থাকবে—কেন একজন নির্বাসিত বাঙালি লেখককে দীর্ঘদিন কলকাতায় ফিরতে দেওয়া হয়নি?
প্রশ্ন বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজের কাছেও
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি ভারতের নয়—বাংলাদেশের।
বাংলাদেশের একজন লেখক কেন নিজের দেশে ফিরতে পারবেন না?
তসলিমা নাসরিন শুধু একজন লেখক নন; তিনি বাংলাদেশের সন্তান। তাঁর সঙ্গে মতের পার্থক্য থাকতে পারে, তাঁর লেখার সমালোচনা হতে পারে, তাঁর রাজনৈতিক বা সামাজিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু এসবের কোনোটিই তাঁকে নিজের দেশে প্রবেশের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার যথেষ্ট কারণ হতে পারে না।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন বহু ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক ভূমিকা নিয়ে গভীর বিতর্ক রয়েছে, এমনকি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কর্মকাণ্ড ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও দীর্ঘ সময় দেশে রাজনৈতিক ও নাগরিক পরিসরে সক্রিয় থাকার সুযোগ পেয়েছেন। সেখানে একজন লেখক কেন নিজের দেশে ফিরতে পারবেন না—এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকে দিতে হবে।
বাংলাদেশের সংসদ, সরকার, সংবিধান ও বিচারব্যবস্থার কাছে প্রশ্ন—
একজন বাংলাদেশি লেখক কেন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারবেন না?
তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়?
তাঁর সঙ্গে ভিন্নমত থাকলেও তাঁকে দেশের নাগরিক ও সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া কি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কর্তব্য নয়?
একজন লেখককে তাঁর লেখার কারণে নির্বাসিত থাকতে বাধ্য করা কোনো রাষ্ট্রের জন্য গৌরবের বিষয় হতে পারে না। মতের বিরোধিতা থাকতে পারে, কিন্তু মতপ্রকাশের অধিকার অস্বীকার করা যায় না। সমালোচনা থাকতে পারে, কিন্তু নাগরিকের ঘরে ফেরার অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না।
তসলিমা নাসরিনের পশ্চিমবঙ্গে প্রত্যাবর্তন তাই একটি নতুন প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—
যে লেখক উনিশ বছর পর পশ্চিমবঙ্গে ফিরতে পারেন, তিনি কবে নিজের জন্মভূমি বাংলাদেশে ফিরবেন?
তসলিমা নাসরিনের ঘরে ফেরা শুধু একজন ব্যক্তির প্রত্যাবর্তনের বিষয় নয়। এটি লেখকের স্বাধীনতা, নারীর অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নাগরিক মর্যাদা এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্রের প্রশ্ন।
আজ পশ্চিমবঙ্গ তাঁকে স্বাগত জানালে বাংলাদেশেরও ভাবা উচিত—
তসলিমা নাসরিন বাংলাদেশের মেয়ে। তাঁর ঘরে ফেরার অধিকার কি আর কতদিন অস্বীকার করা হবে?
তসলিমা নাসরিনের প্রত্যাবর্তন দীর্ঘ সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের বিজয়। কিন্তু তাঁর প্রকৃত ঘরে ফেরা এখনো অসম্পূর্ণ।
তসলিমা নাসরিনের ঘরে ফেরা চাই।
লেখকের স্বাধীনতা চাই।
মতপ্রকাশের অধিকার চাই।
বাংলাদেশের মেয়েকে বাংলাদেশে ফিরতে দিতে হবে।
#তসলিমা_নাসরিন #লেখকের_স্বাধীনতা #মতপ্রকাশের_অধিকার #ঘরে_ফেরার_অধিকার #বাংলাদেশ #পশ্চিমবঙ্গ #সাংস্কৃতিক_প্রতিরোধ #onlinecommunity #personalgrowth
